অপরিচিতা গল্পের মূল কথা মূলভাব

অপরিচিতা গল্পের মূল কথা মূলভাব

প্রিয় পাঠক, আজকে আমি আপনাদের সাথে অপরিচিতা গল্পের মূল কথা মূলভাব বিস্তারিত আলোচনা করবো। আশা করি আপনি এই পোস্টটি পুরো মনোযোগ সহকারে পড়বেন। আপনি যদি এই পোস্টটি পুরো মনোযোগ সহকারে পড়েন তাহলে অপরিচিতা গল্পের মূল কথা মূলভাব বিস্তারিত জানতে পারবেন। প্রিয় পাঠক, চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
অপরিচিতা গল্পের মূল কথা মূলভাব
অপরিচিতা গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত মাসিক সবুজপত্র পত্রিকার ১৩২১ বঙ্গাব্দের (১৯১৪) কার্তিক সংখ্যায়। এটি প্রথম গ্রন্থভুক্ত হয় রবীন্দ্রগল্পের সংকলন গল্পসপ্তক এ এবং পরে গল্পগুচ্ছ তৃতীয় খণ্ডে (১৯৭২)। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ছোটগল্পের প্রাণপুরুষ, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের একজন সার্থক স্রষ্টা। তিনি বাংলা সাহিত্যে অসংখ্য কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ প্রভৃতি সংযোজন করেছেন। অপরিচিতা তাঁর একটি অন্যতম গল্প। এ গল্পে তিনি প্রথমত নায়ক অনুপমেররূপ মাধুর্যের বর্ণনা দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অপরিচিতা’ গল্পটি মূলত তৎকালীন সমাজে প্রচলিত পণপ্রথা ও অন্ধ সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদমূলক রচনা। গল্পের নায়ক অনুপমের বিয়ে ঠিক হয় এক শিক্ষিতা ও রুচিশীল কন্যার সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের আসরে কনের পিতা বরপক্ষের লোভ ও অপমানজনক আচরণে বিরক্ত হয়ে বিয়ে ভেঙে দেন। বিশেষ করে পণের ব্যাপারে বরপক্ষের সংকীর্ণ মানসিকতা ও অর্থলোভ প্রকাশ পায়। কনের বাবা আত্মসম্মান রক্ষার্থে সেই অপমান মেনে নেন না এবং দৃঢ়ভাবে বিয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। পরে অনুপম বুঝতে পারে যে সে একটি মহৎ ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মেয়েকে হারিয়েছে। গল্পের শেষে অনুপমের মনে সেই অদেখা, অচেনা কন্যার প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা ও অনুশোচনা জন্ম নেয়।

গল্পটির মূলভাব হলো আত্মমর্যাদা, নারীর সম্মান ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। রবীন্দ্রনাথ এখানে দেখিয়েছেন যে অর্থলোভ ও সামাজিক ভণ্ডামি মানুষের প্রকৃত সম্পর্ককে নষ্ট করে দেয়। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষিতা ও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন নারীর আদর্শ চরিত্র তুলে ধরেছেন, যিনি অপমানের কাছে নত না হয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন। ‘অপরিচিতা’ তাই শুধু একটি ভাঙা বিয়ের কাহিনি নয়; এটি সমাজ সংস্কারের আহ্বান এবং মানবিক মূল্যবোধের জাগরণের প্রতিচ্ছবি।

অপরিচিতা গল্পের মূল বিষয়বস্তু

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অপরিচিতা’ গল্পটি মূলত নারীর মর্যাদাপ্রতিষ্ঠার এক শক্তিশালী দলিল। এখানে লেখক নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে তার মানসিক দৃঢ়তা, আত্মসম্মানবোধ ও নৈতিক শক্তিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। গল্পের নায়িকা কল্যাণী কেবল একটি বিয়ের পাত্রী নন, তিনি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এক নতুন যুগের নারীর প্রতীক। তাঁর বিদ্রোহ ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং সামাজিক অবমাননার বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। এই বিদ্রোহে তাঁর সহযাত্রী ও নৈতিক শক্তি হলেন তাঁর পিতা শম্ভুনাথ সেন। কন্যার সম্মান রক্ষায় তিনি সমাজের প্রচলিত রীতি, লোকলজ্জা ও ‘লগ্নভ্রষ্ট’ হওয়ার ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বিয়ে ভেঙে দেন।

কল্যাণীর বিয়ে ঠিক হয়েছিল কলকাতার এক এমএ-পাশ যুবকের সঙ্গে, যার অভিভাবক ছিলেন তার মামা—এক লোভী ব্যক্তি। পণের টাকার দরাদরি, স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ এবং নিজস্ব সেকরাকে দিয়ে অলঙ্কার পরীক্ষা করানোর মতো অপমানজনক আচরণে বরপক্ষের নীচতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নায়ক অনুপম এই অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে মেরুদণ্ডহীনতার পরিচয় দেয়। ফলে শম্ভুনাথ সেন নির্বিকার অথচ দৃঢ় প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে সেই অপমানের জবাব দেন। বিয়ের সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হওয়ার পরও তিনি কন্যার মর্যাদাকে সর্বাগ্রে স্থান দেন—এ সিদ্ধান্তই নতুন সময়ের আগমনের সংকেত বহন করে।

গল্পটি অনুপমের আত্মস্বীকারোক্তির ভঙ্গিতে রচিত। মনস্তাপে ভেঙে পড়া, আত্মগ্লানিতে দগ্ধ এক ব্যক্তিত্বহীন যুবকের অনুতাপের মধ্য দিয়েই কল্যাণীর মহত্ত্ব উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অমানবিকতা যেমন এখানে উন্মোচিত হয়েছে, তেমনি পুরুষের ভাষ্যেই নারীর প্রশস্তি কীর্তিত হয়েছে। কল্যাণীর শুচিশুভ্র আত্মপ্রকাশ ভবিষ্যতের আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, সচেতন ও বলিষ্ঠ নারীর আগমনী বার্তা বহন করে। তাই ‘অপরিচিতা’ কেবল একটি ভাঙা বিয়ের গল্প নয়; এটি নারীর সম্মান, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক পরিবর্তনের এক গভীর তাৎপর্যময় কাহিনি।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url